নগর ভবনে প্রভাবের নতুন সমীকরণে আলোচনায় প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১৮-০২-২০২৬ ০১:২৬:৪৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৮-০২-২০২৬ ০১:২৬:৪৫ অপরাহ্ন
গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনের ভেতরে নীরব কিন্তু গভীর এক রদবদল শুরু হয়েছে—এমন অভিযোগ এখন ঢাকার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিশেষ করে Dhaka South City Corporation-এর অভ্যন্তরে ক্ষমতার অদৃশ্য পুনর্বিন্যাস নিয়ে নানা আলোচনা সামনে আসছে। এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন সহকারী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া। দাপ্তরিকভাবে তিনি একজন মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার প্রভাব ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন একই প্রতিষ্ঠানের ভেতরের অনেকেই।
অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক ভারসাম্যে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুতই কিছু ব্যক্তি নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে উঠে আসছে গোলাম কিবরিয়ার নাম। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এখন শুধু প্রকৌশল সংক্রান্ত দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং জনবল নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো সিদ্ধান্তেও সক্রিয় প্রভাব রাখছেন।
দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত কয়েক মাসে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের বাইরে কিছু প্রবণতা দেখা গেছে। কিছু পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক কমিটির অনুমোদন ছাড়াই পরিবর্তন এসেছে বলে তাদের অভিযোগ। তারা মনে করছেন, এসব সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
অভিযোগ উঠেছে, তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেকে জাতীয়তাবাদী ধারার প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে তুলে ধরছেন এবং সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করছেন। অনেক কর্মকর্তা বলছেন, এতে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির প্রত্যাশী ব্যক্তিরা বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়ছে।
সিটি কর্পোরেশনের একটি আলোচিত বিষয় হলো সাম্প্রতিক কিছু পদোন্নতি ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক যাচাই-বাছাইয়ের পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক সুপারিশ কার্যকর হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়নি, তবুও বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা থেমে নেই।
অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, একসময় তিনি Awami League সরকারের সময় প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন বলে অভ্যন্তরীণভাবে ধারণা প্রচলিত ছিল। তখন তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য কোনো অসন্তোষ দেখা না গেলেও এখন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলানোর পর সেই সময়কার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা নতুন করে সামনে আসছে।
একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, প্রশাসনের ভেতরে এখন দ্বৈত চাপ কাজ করছে—একদিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামো, অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক প্রভাব। এই দুইয়ের সংঘর্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রশাসনিক কার্যকারিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, তার ঘনিষ্ঠরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো তোলা হচ্ছে, তা মূলত প্রতিযোগিতামূলক অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফল। তারা দাবি করেন, তিনি সংগঠনিকভাবে সক্রিয় হওয়ায় এবং প্রশাসনিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় একটি গোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
কিছু কর্মকর্তার মতে, সিটি কর্পোরেশনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয় নতুন কিছু নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে কারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণেও পরিবর্তন এসেছে। কিছু অপেক্ষমাণ কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের তালিকায় এসেছে, আবার কিছু চলমান কাজের গতি কমেছে। যদিও এসব পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তার কথা বলে, তবুও অভ্যন্তরীণভাবে অনেকেই এটিকে প্রভাবের ফল হিসেবে দেখছেন।
প্রশাসনের ভেতরে কাজ করা এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে প্রতিষ্ঠানের ওপর। এতে কর্মীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। তিনি মনে করেন, স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হলে সব সিদ্ধান্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, গোলাম কিবরিয়ার ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের দাবি, তাকে ঘিরে যে আলোচনা চলছে তা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এদিকে সিটি কর্পোরেশনের ভেতরে এক ধরনের নীরব বিভাজনের কথাও শোনা যাচ্ছে। একাংশ মনে করছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা রক্ষায় নিরপেক্ষতা জরুরি, অন্য অংশ মনে করছে সংগঠনিক সক্রিয়তা প্রশাসনিক কাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ব্যক্তি বনাম প্রতিষ্ঠান—এই দ্বন্দ্ব সামনে চলে এসেছে। প্রশাসনের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা নিয়মতান্ত্রিক এবং কতটা প্রভাবনির্ভর—এই প্রশ্ন এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত শুরু হয়নি, তবুও অভ্যন্তরীণভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, স্থানীয় প্রশাসনের ভেতরেও প্রতিফলিত হচ্ছে। এবং এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে।
পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এতটুকু নিশ্চিত যে প্রশাসনিক ভারসাম্য ও আস্থার প্রশ্নটি এখন ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স